বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বাম দলগুলোর উত্তাপহীন হরতাল
ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বাম দলগুলোর ডাকা হরতালে জনজীবনে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। রাজধানীসহ সারা দেশে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সংগঠনগুলোর একাধিক নেতাকর্মীকে আটকের অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে নেতাকর্মীদের। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সারা দেশে আধাবেলা হরতাল ডেকেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এবং গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। ভোর ৬টা থেকে ওই হরতাল শুরু হয়। চলে দুপুর ২টা পর্যন্ত। সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল্লাহ আল ক্বাফি রতন জানিয়েছেন, সিপিবি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মুক্তি ভবনে প্রবেশ করে পুলিশ। ভোর ৫টার দিকে পুলিশ ছয়তলায় দলের নেতাকর্মীদের অবরুদ্ধ করে রাখে। ক্বাফি রতন আরো জানান, সিপিবি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ছাত্রনেতা দীপক শীল, জহর লাল রায়, মোর্শেদ হালিম, নোবেল বড়ুয়া, শ্রমিক নেতা জালাল হাওলাদার, যুবনেতা শাখারভ হোসেন সেবকসহ ১১ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে সিপিবির কার্যালয় থেকে জানানো হয়, আটকের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ওই ১১ জনকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এ সময় ক্বাফি রতন আরো জানান, বাইরে সিপিবি কার্যালয়ে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়, যাতে নেতাকর্মীরা হরতালে অংশ নিতে না পারে। এ ব্যাপারে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হক জানান, সিপিবি কার্যালয়ের সামনে থেকে ওই ১১ জনকে আটক করা হয়। এ সময় সড়কে আগুন জ¦ালানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। এদের পল্টন থানায় নিয়ে আসা হয়। তবে ১০ মিনিট পরই এদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এদিকে মোহাম্মদপুরে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার অন্যতম সংগঠন গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য জুলহাসনাইন বাবুকে আটক করা হয়েছে। ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও গণসংহতি আন্দোলনের সদস্য সৈকত মল্লিক জানান, হরতালের সমর্থনে মিছিল করার সময় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে জুলহাসনাইন বাবুকে আটক করে পুলিশ। দুপুর ১টার পর মোহাম্মদপুর থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় জুলহাসনাইন বাবুকে। সিপিবি নেতা ক্বাফি রতন আরো জানান, রাজধানীতে সিপিবির আজিজুর রহমান, আহসান হাবীব লাবলুসহ ১৫ জনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া খুলনায় সিপিবি নেতা এস এ রশীদ, ছাত্রনেতা উত্তম, বাসদ নেতা মিথুনসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছেন। জামালপুরে সিপিবির সভাপতি মোজাহারুল হক মোজা, সহকারী সাধারণ সম্পাদক মানিক, ছাত্রনেতা সুজনকে আটক করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জে সিপিবি সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক, রীতা রানী, মাহতাবউদ্দিন, রজব আলী, দেবু, বাসদের জুনায়েদ ইসলাম, জাকির হোসেন পুলিশি হামলায় গুরুতর আহত হন। তবে এসব আটকের বিষয় পুলিশের সঙ্গে কথা বলে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এদিকে, হরতালে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয় প্রগতিশীল ছাত্র জোট। এছাড়া সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার কর্মীরা সকাল থেকে পল্টন, প্রেসক্লাব, গুলিস্তান, দৈনিক বাংলা মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় খ- খ- মিছিল নিয়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ‘গণবিরোধী সিদ্ধান্ত’ বাতিলের দাবি জানান। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে, যা কার্যকর হবে আগামি ডিসেম্বর থেকে। গত ২৩ নভেম্বর বিইআরসির ওই ঘোষণার পরপরই হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করে বাম দলগুলো। তাদের ভাষায়, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ওই সিদ্ধান্ত গণবিরোধী। বামদের এই কর্মসূচিতে সমর্থন দেয় বিএনপি, বিকল্পধারা, নাগরিক ঐক্য ও জেএসডি। এ ছাড়া তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিও এ হরতালে সমর্থন জানায়। সকালে হরতালের শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড় থেকে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ের দিকে অগ্রসর হন। শাহবাগ থানার সামনে পুলিশ বাধা দিলে তা ভেঙে তারা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। কিন্তু পুলিশ এ সময় সাঁজোয়া যান থেকে বিকট শব্দ সৃষ্টি করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়। প্রগতিশীল ছাত্র জোটের কর্মীরা তখন মিছিল নিয়ে শেরাটন মোড় ও কাঁটাবন মোড় ঘুরে আবার শাহবাগে এসে অবস্থান নেন। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি জিএম জিলানী শুভ ও সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নাঈমা খালেদ মনিকা ও সাধারণ সম্পাদক স্নেহার্দি চক্রবর্তী রিন্টু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভা মজুমদার এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ও বিভিন্ন বাম ছাত্রসংগঠনের দেড়শতাধিক নেতাকর্মীকে এই বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা যায়। প্রগতিশীল ছাত্র জোটের সমন্বয়ক ও কেন্দ্রীয় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একাংশের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স বলেন, সকাল থেকে শাহবাগে আমরা অবস্থান নিয়েছি। মিছিল ও সমাবেশ করছি। কিন্তু পুলিশ এক ধরনের শব্দ তৈরি করে আমাদের বার বার সরিয়ে দিতে চাইছে। এ আগে হরতালের সমর্থনে মঙ্গলবার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচার মিছিল ও গত বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে মশাল মিছিলের কর্মসূচি পালন করে প্রগতিশীল ছাত্র জোট। কর্মসূচির আগের দিন গত বুধবার পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, সরকার এমন এক সময়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে, যখন চাল, পিঁয়াজসহ নিত্য পণ্যের দাম নিয়ে মানুষ দিশেহারা। বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধির কারণে শ্রমজীবী মেহনতি, স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ এবং নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্দশা, দুর্গতি আরও বেড়ে যাবে। হরতাল ডাকার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এখনি জনগণের উপর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির অত্যাচার-আঘাত প্রতিরোধ করতে না পারলে আগামি দিনগুলোতে জনগণের উপর আরও নতুন নতুন অত্যাচার নেমে আসবে। সিপিবি সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম জানান, হরতাল শেষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন তারা।